১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ |

বাঁচুক সুন্দরবন, বাঁচুক বাংলাদেশ

 

অলোক আচার্য:

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘন শিকার হচ্ছে। সারাবিশে^ই অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এরমধ্যে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় বিভিন্ন সময়ে ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে। প্রাণহানির সাথে সাথে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে ব্যপক। অতি সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের হাত থেকে ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করেছে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। কেবল বুলবুলের হাত থেকেই নয় এর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর মারাত্বক ঘূর্ণিঝড় সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার বিরুদ্ধে বুক পেতে দাড়িয়েছিল। না হলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতো। ঘূর্ণিঝড়ের সুন্দরবনে আঘাত করে দুর্বল হয়ে পরে।

মায়ের আঁচলের মতো ঢাল হয়ে খুলনা ও সাতক্ষিরা উপকূলকে রক্ষা করেছে। তাই বাঁচাতে হবে এই অস্তিত্তকে। পৃথিবীর বহু বনের মতো সুন্দরবনেও লোভী মানুষের চোখ রয়েছে। চোরাকারবারীদের লোভী দৃষ্টি রয়েছে এই বনের দিকে। সুন্দরবন, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের আঁধার। কেবল নামে সুন্দর নয়, মুগ্ধ করার মত গঠনশৈলী আর প্রাণী সম্পদের নিদর্শন এই সুন্দরবন। অসংখ্য পরিচিত অপরিচিত বৃক্ষরাজি, প্রাণীকুল নিয়ে যুগ যুগ ধরে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রেখে চলেছে। সুন্দরবনের কথা শুনলেই মনের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে গায়ে ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গোলপাতা,জোয়ার ভাঁটা আর মৌয়ালদের কথা। বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম জোয়ারধৌত গরান বনভূমি।

নানা ধরনের গাছপালার চমৎকার সমারোহ ও বিন্যাস এবং বন্যপ্রাণীর সমাবেশ এ বনভূমিকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। আজ থেকে প্রায় দুই শত বছর আগেও এ বনভূমির এলাকা ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার। বিশে^র অধিকাংশ বনভূমির অবস্থা আজ অস্তিত্ত সংকটে। আমাজানের মত বিশাল বন যার সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা ছিল যে এটি কোনদিন সংকুচিত হবে না তাও আজ মানুষের লোভের কারণে আয়তন হারাচ্ছে। মানুষের লোভের শিকার ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে আমাদের সুন্দরবনও আয়তন হারাচ্ছে। বর্তমানে নানা কারণে ছোট হতে হতে প্রকৃত আয়তনের এক তৃতীয়াংশে পৌছেছে। ভারতীয় উপমহাদেশ দুইভাগে ভাগ হলে সুন্দরবনের দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের এবং বাকিটা ভারতের অংশে পরেছে। বাংলাদেশের ভাগের আয়তন প্রায় বর্গকিলোমিটার। ১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ বনভূমির প্রায় ৩২৪০০ হেক্টর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুন্দরবনের নাম ঠিক কি কারণে সুন্দরবন হলো তা একেবারে ষ্পষ্ট বলা যায় না তবে প্রচলিত এবং গ্রহণযোগ্য মত যে এই বনের সুন্দরী বৃক্ষের নাম থেকেই করা হয়েছে।
কারণ এ বনে প্রচুর সুন্দরী গাছ দেখতে পাওয়া যায়।

গাছপালা,প্রাণীকুল,সরীসৃপ,উভচর প্রাণী,মাছ ইত্যাদি মিলিয়ে সুন্দরবন আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। এ বনভূমির বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ পশ্চিম এলাকার লবণাক্ত পানির গেওয়া, গরান, কেওড়া, ওড়া, পশুর, ধুন্দুল, বাইন ইত্যাদি। দক্ষিণ অংশের অধিকাংশ এলাকা পরিমিত লবণাক্ত পানির বনে ঢাকা, আর প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী। ঘনভাবে জন্মাতে দেখা যায় গোলপাতা। যার ছাউনি দিয়ে ঘর নির্মাণ করা যায়। পশুর, হরিণঘাটা এবং বুড়িশ^র নদী দিয়ে প্রবাহিত প্রচুর স্বাদুপানি লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস করে পাশ^বর্তী এলাকায় সহনীয় স্বাদুপানির বন এলাকা গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। সুন্দরবনের প্রাণীকুলের কথা আসলে প্রথমেই আসে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। তবে কেবল রয়েল বেঙ্গল টাইগারই নয় বরং আরও অনেক প্রাণীকুলের আবাসস্থল এই সুন্দরবন। এ বনভূমিতে আছে প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী (উল্লেখযোগ্য চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, রেসাস বানর, বনবিড়াল, লিওপার্ড, সজারু, উদ এবং বন্য শুকুর), ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি (উল্লেখযোগ্য বক, সারস, কাঁদাখোচা, হাড়গিলা, লেনজা, গাংচিল, জলকবুতর, টার্ন, চিল, ঈগল, শকুনসহ দেশি প্রজাতির পাখি), প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ (গুইসাপ, কচ্ছপ ও নানা প্রজাতির সাপ), ৮ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। এ বিশাল বন ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এ অর্থনীতির প্রথমেই রয়েছে চিংড়ি। যা সাদা সোনা নামে পরিচিত। প্রায় ২০ প্রজাতির চিংড়ির মধ্যে বাগদা চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি বাণিজ্যিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ চিংড়ি চাষ এবং বাণিজ্যের সাথে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া সুন্দরবনকে ঘিরে একটি বিশলা অংশ মাছ ধরার সাথে জড়িত। এই মাছ ধরেই তাদের জীবন ও জীবিকা চলে। মাঝে মাঝে তারা বাঘের আক্রমণেরও শিকার হয়। তারপরেও এই সুন্দরবনই তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম উৎস। অর্থনৈতিকভাবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার নাম মৌয়াল যারা এ বনের মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তার বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে ফুলের মৌসুমে তিন-চার মাস বন থেকে মধু সংগ্রহ করে। এই মধু পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। আমাদের দেশের জন্য এ বন আশীর্বাদস্বরুপ। এ বনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি না রাখলে তা আমাদের জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। কারণ নানা কারণে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে চলেছে।

চোরাকারবারীদের দৌরাত্মে প্রতিনিয়তই সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এসব অবিবেচক,লোভী ও অসাধু মানুষের জন্য দেশের কোটি কোটি মানুষের হুমকি তৈরি হচ্ছে। একটি বন কেবল একটি বন নয় তার সম্পর্ক থাকে সেই জাতির সাথে। চোরাকারবারিরা এ বন থেকে কাঠ কেটে পাচার করছে। শিকারিদের লোভের শিকার হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ,শুকুরসহ নানা প্রাণী। এতে বনের খাদ্য শৃঙ্খলের ওপর মারাত্বক ক্ষতিকর প্রভাব পরছে। বাঘ খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে প্রবেশ করে মানুষের হাতে মারা পরছে। অথচ এই বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে আজ তা অস্তিত্ত হারানোর পথে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবন মহা গুরুত্মর্পূণ। বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে গেলে বনায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় বনভূমি নেই। কোন দেশের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। আমাদের তা নেই। যেটুকু আছে তাও যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি তাহলে তা হবে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মত অবস্থা। পর্যটন শিল্পেও এ বন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর প্রচুর দেশি বিদেশি পর্যটক এ বন দেখতে যায়। সেক্ষেত্রে এটি আমাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রেখে চলেছে।

সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি মহলকে আরও কঠোর ভূমিকারয় অবর্তীণ হতে হবে। সুন্দরবনের আশেপাশে যারা বসবাস করে মূলত তারা এ বনের ওপর তাদের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বেঁচে থাকে। তাদের যদি বিকল্প আয়ের পথ গড়ে তোলা যায় তাহলে তারা বনের কোন ক্ষতিসাধন করবে না। সুন্দরবনের ভেতর অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বনের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল এবং সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে হবে। কারণ পাচারকারীরা শক্তিশালী এবং চতুর। তাই তাদের মোকাবেলা করার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। যারা কর্মঠ.সৃজনশীল,দুরদৃষ্টিসম্পন্ন , সাহসী এবং বন রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প হয়। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য পরিকল্পিত বনায়নের পাশাপাশি বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ রক্ষা করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি প্রাণী ও ভেষজের আঁধার সুন্দরবন। সবাই মিলেই সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। আইলা, সিডর বা বুলবুল শেষ দুর্যোগ নয়। এরকম দুর্যোগ আরও অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। নিজেদের রক্ষা করতে উদ্যোগী হয়ে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে যেকোনো উপায়ে।

অলোক আচার্য : কলামিস্ট

(Visited ২৬ times, ১ visits today)

আরও পড়ুন

হযরত খাজাবাবা (রঃ) ও জামে আওলিয়া কেরামের পথ পূণরুদ্ধার সম্মেলন অনুষ্ঠিত
বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে এ জাতি কলঙ্কিত হয়েছে বিশ্ব দরবারে
বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোবা কান্না
মহান জাতীয় শহীদ দিবস শাহাদাতে কারবালা দিবসে ফেনীতে র‍্যালী
মুসলিম মিল্লাতের মহান জাতীয় শহীদ দিবস উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড সুন্নী মুভমেন্টের সমাবেশ
মহররম ঈমানী শোক ও ঈমানী শপথের মাস, আনন্দ উদযাপনের নয় – আল্লামা ইমাম হায়াত
করোনায় সারাদেশে আরও ৭ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১৯৯৮
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা