৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

ভয়ানক দ্বীপ যাত্রা

সময়টা ২০১১ সাল, জুলাই মাসের মাঝামাঝি। তখন রোজার মাস ছিল। আছরের নামাজ শেষ করে একটা পুরানো পত্রিকার খেলার পাতা পড়ছিলাম। হঠাৎ করে পত্রিকার শেষের পাতায় বড় করে লিখা একটা হেড়লাইনে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে যাই! প্রকৃতির অপরূপ মায়া মাখা একটা ছবির উপরে লিখা ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় সুন্দরবন নিজুম দ্বীপ!

২০০৮ সালে আতাতুর্ক মডেল হাই স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে থাকতে স্কুলের বার্ষিক শিক্ষা সফরে আমাদের নিজুম দ্বীপ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বড় ভাইদের ব্যাগ আর পানির বোতল টানতে টানতে আমার আর প্রকৃতিরঞ্জন উপভোগ করা হয়নি। বড় আফসোস নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম।
আজকে আবার এই ছবি আর হেডলাইনটা দেখে মনের মধ্যে একটা প্রকৃতি প্রেম জেগে উঠলো। ইচ্ছে হচ্ছে আবার ঘুরে আসি সেই প্রকৃতি মেলা নিজুম দ্বীপ থেকে। কিন্তু পথটা সহজ নয়, ইস্টিমার অথবা লঞ্চ যোগে যেতে হবে নিজুম দ্বীপ। তারপরও যেন একটা সাহস কাজ করছে আমি পারবো। সেদিন রাতে আমার ঘুম হয়নি, কিভাবে কবে বা কাদের নিয়ে যাওয়া যায় এই চিন্তায়!

সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটা লম্বা লিস্ট করলাম বন্ধুদের। তারপর এক এক করে সবাইকে বললাম। কিন্তু কেও যেতে রাজি হলো না শুধু একজন ছাড়া! আর সে হচ্ছে আমার প্রিয় বন্ধু সম্পর্কে মামা বিজয়। আমরা ছোট থেকেই দু’জন এক সাথে বড় হয়েছি তাই আমাদের মধ্যে মনের খুব ভালো মিল ছিল।
এরই মধ্যে ২০ রমজান, শেষ খবর নিয়ে জানতে পারি ঈদের সময় নিজুম দ্বীপে পর্যটকদের সমাগম হয়। তবে কমপক্ষে ৭/৮ জন না গেলে মজা করা যাবেনা! এদিকে আমরা মাত্র ২ জন তার মানে যাওয়া অসম্ভব। আমি অনেকটা হাল ছেড়ে দিলেও বিজয় হাল চাড়তে রাজি নয়। এরেই মধ্যে আমি ও বিজয় আরো ৫ জনের লিস্ট করলাম যাদের যাওয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু টাকার সমস্যা!

২৪ রমজান বিকেলে আমি ও বিজয় তাদের নিয়ে মসজিদের এক কোণে বসে জোরালো ভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু টাকার বাজেট দেখে তারা কেউই রাজি হলো না!

প্রথমে আমরা জনপ্রতি ১০০০ টাকায় এক রাত ২ দিনের একটা প্লান করি, কিন্তু তাদের সমস্যার কথা চিন্তা করে অনেক খরচ বাদ দিয়ে শেষমেষ ৭০০ টাকায় সবাইকে রাজি করাই। তখন আমরা সবাই স্কুলে পড়তাম। এত টাকার ভরসা ছিল একমাত্র ঈদ সালামি। যদি সালামি পাই ৭০০/১০০০ হয় তাহলেই আমাদের সাত জনের নিজুম দ্বীপ যাওয়া হবে। তবে এত টাকা জোগাড় করাটা ছিল পাহাড় সমান চাপ। তারপরও আমাদের ইচ্ছে শক্তি ছিল মূল ভরসা। ২৫ রমজান থেকে ২৯ রমজান পর্যন্ত আমরা প্রায় প্রতিদিনই ছোট একটা আলোচনা সভা করতাম নিজুম দ্বীপ নিয়ে। এরেই মধ্যে আমাদের সবার ২০০/৩০০ টাকা করে প্রায় জমানো হয়ে গেছে।

তবে সবার থেকে বেশি টাকা জমানো ছিল পাবেলের, ৫০০ টাকা! দেখতে দেখতে ঈদ চলো আসলো ঈদের দিন সকাল থেকেই সবাই ঈদ সালামি নিয়ে দৌড়ের উপর ছিলাম যে যা দিয়েছি চোখ বন্ধ করে নিয়ে নিয়েছিলাম। বিকেল পর্যন্ত হিসেব করে দেখলাম আমার মোট ৮৭০ টাকা সালামি পেয়েছি এবং জমানো ৩০০ সহ সর্বমোট ১১৭০ টাকা। অন্যদিকে বিজয়, শামিম, প্রান্ত, স্বপন, আলো সহ সবার প্রায় হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু ঈদের নামজের পর থেকে পাবেল কে আর খুঁঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা সবাই পাবেলদের বাড়ি গেলাম। ঘরের এক কোণে বসে আছে পাবেল চোখে মুখে কান্নার ভাব! জমানো শেষ টাকা গুলো ঈদগাহে হারিয়ে অনেকটা শান্ত হয়ে বসে আছে। যে ছেলেটা সবার থেকে সব্বোর্চ টাকা জমিয়ে রেখেছিল আজ সে টাকা হারিয়ে তার যাওয়াটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল! এত গুলো টাকা দিয়ে তাকে আমাদের সাথে নেয়ার মত সামর্থ্য তখন আমাদের কারোই ছিল না। চোখটা নিচে নামিয়ে আমরা যে যার মত করে চলে আসি। সন্ধ্যা নামতেই পচন্ড বাতাস আর বৃষ্টি যেন এক নিমেষেই শেষ করে দিতে চললো আমাদের এতদিনের স্বপ্ন সেই প্রকৃতি মাখা নিজুম দ্বীপ যাওয়ার আশা! তখন রাত ৮ টায় হঠাৎ খবর পাই স্বপনের শরীর প্রচন্ড জ্বর আর প্রান্তর নাকি সিঁড়ি থেকে পড়ে পা কেঁটে গেছে। সবার পরিবার থেকে বারণ করা হয়ে গেছে এই আবহাওয়ায় কারো কোথাও যাওয়া চলবে না। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। মনটা একদম খারাপ হয়ে গেলো সারা রাত বৃষ্টি হচ্ছে সাথে বাতাস আর বজ্রপাত। এক বুক কস্ট নিয়ে দু’চোখ কোন ভাবে বন্ধ করেছিলাম।

অনেকটা ভোর রাত তখন, ৪:৫০/৫:০০ হবে, বাহিরে টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে জানালার উপর পাশ থেকে চেনা কন্ঠে আস্তে আস্তে করে কে যেন সাগর সাগর করে ডেকেই যাচ্ছে। কোন ভাবে উঠে জানালা খুলতেই দেখি বিজয় আর প্রান্ত দাঁড়িয়ে আছে। আমি চোখ জোড়া ভালো ভাবে মুচে দেখি এটা স্বপ্ন নয় বাস্তব। জানালার অপর পাশ থেকে বিজয় বললো তাড়াতাড়ি কর সবাই তোর জন্য বাহিরে অপেক্ষা করছে। ঘরের কেউ জেনো কিছু না বুজতে পারে সকাল হওয়ার আগেই আমাদের পালাতে হবে।

◾দ্যা কিং অব সেভেন♥
◾পর্ব -০১

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

গৌরব, আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাসের পদ্মা সেতু
মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, না মানলে শাস্তি
ডলারের বিপরীতে আবারও কমলো টাকার মান
ঈদ সামনে রেখে ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু ৬ জুলাই
পদ্মা সেতুর বুথ ব্যারিয়ারে বাসের ধাক্কা
বাড়ছে করোনা আসছে কঠোর নির্দেশনা!
মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু সাঁতরে মঞ্চে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলল কিশোরী