৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

মৎস্য চাষে তারা সফল; করোনাকালে সরকার দেবে প্রণোদনা

প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশের যোগানদার বাংলাদেশের মাৎস্য সম্পদ। দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এখন মাছ চাষ এবং এই সম্পর্কিত ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা, জিডিপি, রফতানি আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মৎস্য তথা পুকুরে মাছ চাষের গুরুত্ব অপরিসীম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্যসম্পদের অবদান এখন ৪ শতাংশ।
গত বছর ইফপ্রির একটি প্রতিবেদন বলেছিল, বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশ মাছ আসছে পুকুর থেকে। পুকুরে মাছ চাষের কারণে গত তিন দশকে মোট উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। মাছ চাষ ও ব্যবসায় দুই কোটির কাছাকাছি মানুষ যুক্ত আছেন।

পুকুরে মাছ চাষের সফলতা,সমস্যা,সম্ভবনার বাস্তব চিত্র জাগো নিউজে তুলে ধরতে যাওয়া হয় ময়মনসিংহের আলালপুরে। এই এলাকার বহু মানুষ এখন মৎস্য চাষের সাথে সম্পৃক্ত। কথা হয় পুরাতন মৎস্য চাষি মোঃ মনিরুজ্জামান জুয়েলের সাথে। বয়স তার ৫৮ ছুঁই ছুঁই। ছোট সংসার তার। ১ ছেলে ২ মেয়ে। প্রথমে ছোট আকারে পুকুরে মাছ চাষ করলেও এখন চার একর জায়গায় ৪ টা ফিসারী তার ,অারো একটি ফিসারী বাড়ানোর কাজ চলমান। তিনি জানান,মৎস্য চাষ করে এখনো অামি লাভবান। প্রথমে যখন মৎস্য চাষে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা ভাবছিলাম, তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যদি কোনো কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হই তবে অার ঘুরে দাড়াঁতে পারব কিনা সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু ভয়কে দূর করে ছোট অাকারে একটি পুকুর খনন করে বাংলা মাছের চাষ করা শুরু করি। প্রথম বছরেই অাশার অালো দেখি। দিন দিন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে লাভবান হতে থাকি।তখন ফিসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করার সাথে সাথে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করি।অামি এখন মৎস্য চাষ করে সফল।

সফলদের অনুকরণ করেই অনেকে একই ব্যবসা শুরু করেন। ঠিক তেমনে অাতিকুর রহমান প্রথমে ধানের ব্যবসা দিয়ে অার্থিক স্বচ্ছলতার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় লাভের মূখ দেখতে পারেননি। অার তখনই পরিবারের হাল ধরতে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি দেখেন তার চোখের সামনেই অনেকে মৎস্য চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন।তখনই সফল মৎস্যচাষীদের সাথে পরামর্শ করে মৎস্য চাষের সাথে সম্পৃক্ত হন। তিনি জানান,অামার বয়স মাত্র ৩৫ বছর। শুরুটা ছোট পরিসরে হলেও এখন তা বৃদ্ধি করে ৬ একর জায়গার উপর হেচারী ১ টি,অার ১২ টি ফিসারী করেছি।যদি লাভ নাই হতো তাহলে এতগুলো বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিলনা। তার ১ টি মাত্র সন্তান নিয়ে তিনিও এখন সুখী। সুমন জানান, তার এখন বৎসরে ৭/৮ লাখ টাকা অায়।

একেবারেই নতুন মৎস্য চাষি মুসলেম উদ্দীন।তিনি একজন গরীব কৃষক। হয়েছেন বয়োবৃদ্ধ। বয়স ৬৫ বছর। শুধু কৃষি কাজ করে তার সংসারে টানাপোড়োন দেখা দেয়। তিনি চিন্তা করেন কিছু একটা করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে অানতে হবে।তার মনে প্রচন্ড সাহস ছিল।তিনি জানান,অামাদের এলাকার খায়রুজ্জামানকে দেখে উৎসাহ পেয়েছি। সফল মৎস্য চাষি খায়রুজ্জামান নতুন মৎস্য চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণার পাত্র। মুসলেম উদ্দিন সফল এই মৎস্য চাষির কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে মৎস্য চাষ শুরু করেন। তিনি জানান,অামার এখন অার চিন্তা নাই।কৃষি কাজ করি, ৭০ শতাংশ জমির উপর মৎস্য চাষ করি।এতটুকু জায়গার মাছ বিক্রি করেই ভালো লাভবান হয়েছি। সামনের বছর অারো বড় অাকারে মৎস্য চাষ করব।

মৎস্য চাষের ফিসারী অার হেচারীতে কাজের সাথে সম্পৃক্ত করেকজন শ্রমিক জানান, অামরা দীর্ঘদিন যাবৎ এখানে কাজ করি। কেউ ৯ হাজার টাকা অাবার কেউ ১০ হাজার টাকা বেতন পাই।এই টাকা দিয়েই অামাদের সংসার চালাই।

ময়মনসিংহের সফল মৎস্য চাষি অালালপুর হেচারী এন্ড ফিসারীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মোখলেছুর রহমান। তার বাবা হাজ্বি ওমর অালী ছিলেন একজন সফল মৎস্য চাষি। মোখলেছুর রহমান পরাশুনা শেষ করে বিভিন্ন ফার্মাসিউক্যালসে চাকরি করতেন। হঠাৎ তার বাবা মারা যান। তিনি জানতেন তার বাবা মৎস্য চাষে সফলতা অর্জন করেছেন।অার তাই তিনি চাকরি ছেড়ে ২০১০ সালে মৎস্য চাষে মনোনিবেশ করেন। হয়েছেন বাবার মতোই সফল। বর্তমানে ২৫/২৭ একর জায়গার মাঝে তাদের ৪০/৪৫ টার উপরে ফিসারী রয়েছে। পাশাপাশি হেচারী ২ টা। তাদের পরিবারে ৪ ভাই ২ বোন। সবাই মিলে সবগুলো ফিসারী দেখাশোনা করেন। তার এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ২০/২২ জন শ্রমিক। মোখলেছুর রহমান জানান, মৎস্য চাষের সময়টা ভালোই যাচ্ছিল।হঠাৎ করে করোনা মহামারি মাছ চাষে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।একদিকে কিছু মাছের খাদ্যের দাম বিভিন্ন কোম্পানি বাড়িয়ে দিয়েছে ,অন্যদিকে লকডাউনের সময়টাতে মাছ ঠিকমতো পৌছানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়েছে।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অামার ফিসারীর মাছ অার হেচারীর পোনা যায়। গাড়ী মাছ নিয়ে যেতে পারলেও ফিরে অাসার সময় মাছের খালি গাড়ীতে পুলিশের চেকপোস্টসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়।তিনি বলেন, করোনাকালের সময়টা মৎস্য চাষিদের ভালো যাচ্ছেনা। তবে এমন সময় বেশীদিন থাকবেনা। মৎস্য চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা উল্লেখ করে বলেন,অামি শিং,মাগুর,টেংরা,গুলসা,সিলবার,রুই,কাতলা, মৃগেল,কালবাউশ,কই, তেলাপিয়া ও সরপুঁটিসহ সকল ধরলের বাংলা মাছ চাষ করে লাভবান হয়েছি । অাগ্রহী নতুন এবং শিক্ষিত বেকার যুবকদের মৎস্য চাষে যোগ দিতেও গুরুত্ব দেন তিনি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সাহা মানব বার্তাকে জানান, বিভাগে ৬ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।উৎপাদিত মাছের সাড়ে ৩ লক্ষ মেট্রিক টন জেলার বাইরে পাঠানো হয়।
বিভাগে ২ লক্ষ ৯ হাজার ৪৩৩ জন মৎস্য খামারি অাছে। এর মধ্যে ৩২৩ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত হেচারী রয়েছে এবং প্রায় সাড়ে ১৬ শ’এর মত নার্সারি রয়েছে।তিনি বলেন,মার্চ – এপ্রিলে লকডাউন থাকার কারণে মৎস্য চাষিদের উপর প্রভাব পড়েছে।এর জন্য সরকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা ৪% সুদে প্রণোদনা দিবে। ইতিমধ্যে ২৪ টা ব্যাংকের সাথে সরকারের চুক্তি হয়েছে।ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি পেয়েছি। তবে অালোচনার পরেই বলা যাবে ময়মনসিংহ জেলায় মৎস্য খামারিদের জন্য কত টাকা প্রণোদনা অাসবে। এই প্রণোদনার ক্ষেত্রে মৎস্য চাষীদের ৩ টি শ্রেণীতে ভাগ করে প্রণোদনা দেয়া হবে।

বিশেষ করে হেচারী, নার্সারি ও খামারিদের তালিকা তৈরি করা হবে।

তিনি বলেন,অামরা সবসময় মৎস্য চাষিদের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছি। যদি কেউ মৎস্য চাষ শুরু করতে চায় তবে আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেব।

#মোরশেদ

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, না মানলে শাস্তি
ডলারের বিপরীতে আবারও কমলো টাকার মান
ঈদ সামনে রেখে ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু ৬ জুলাই
পদ্মা সেতুর বুথ ব্যারিয়ারে বাসের ধাক্কা
খাবার নিয়ে বন্যার্তদের পাশে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ
বাড়ছে করোনা আসছে কঠোর নির্দেশনা!
মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতু সাঁতরে মঞ্চে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলল কিশোরী