৩০শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |

রাঙ্গাবালীতে কবে লাঘব হবে বিদ্যুতের সংকট ||

যখন উন্নত বিশ্ব মঙ্গল গ্রহকে বাসযোগ্য করার পরিকল্পনা করে তখনও আমাদেরকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় অন্ধকারের সাথে।

হয়তো অনেকে শুনে অবাক হবে এই সময় এসেও বিদ্যুৎতের জন্য হাহাকার করে মানুষ। হ্যা সত্যিই শুনছেন, রাঙ্গাবালী উপজেলা বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলা যেখানে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎতের আলো আসেনি।

রাঙ্গাবালী উপজেলাটি পটুয়াখালী জেলার সর্বদক্ষিনে বঙ্গোপসাগরের পাদদেশে অবস্থিত। উত্তরে চালিতাবুনিয়া ও আগুনমূখা নদী, পশ্চিমে রামনাবাদ চ্যানেল ও কলাপাড়া উপজেলা পূর্বে চর ফ্যাশন উপজেলার চর কুররী-মুকরী এবং দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর। এর আয়তন ৪৭০.১২ বর্গ কিঃমিঃ।

৭ জুন ২০১১ তারিখে নিকারের (ন্যাশনাল ইপপ্লিমেন্টেশন কমিটি ফর এ্যাডমিনিস্ট্রেশন রিফর্ম) ১০৫ তম সভায় রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রশাসনিক অনুমোদন হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ জুন ২০১১ তারিখে বাংলাদেশ গেজেট প্রকাশিত হয়। শুভ উদ্ধোধন হয় ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১২ খ্রিঃ।

বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অতঃপ্রতভাবে জড়িত। আধুনিকতার ছোয়ায় দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। উন্নয়নের সাথে তালমিলিয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলাও বদলাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু পিছিয়ে রয়েছে অন্যান্য উপজেলার থেকে অনেকটা। পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারন হচ্ছে বিদুৎ সেবা না পৌছানো। দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য স্থান এই রাঙ্গাবালী উপজেলা। যেখানে মৎস সম্পদসহ রয়েছে বহু পর্যটন এলাকা। যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করে। এখানে সৌর বিদ্যুৎ-ই হচ্ছে একমাত্র ভরসা। যা মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরন করতে অক্ষম। এই উপজেলার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ততটা ভালো না যার ফলে সবার ঘরে সৌর বিদুৎ ও নেই। আর সৌর বিদুৎ নির্ভর করে সূর্যের উপর। রোধ না থাকলে সৌর বিদ্যুৎও চলে না। যার ফলে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পরতে হয় বর্ষার সময়ে।

বিদ্যুৎ না থাকায় এই উপজেলার মানুষের জনজীবনে ভোগান্তির শেষ নেই।
যেমন,
✦ পন্য মজুদ রাখতে পারছেন না। বিদ্যুতের অভাবে ফ্রিজ চালাতে না পেরে ভোগান্তিতে আছে ব্যবসায়ীমহল। তাদের পন্য মজুদ রাখতে না পারায় লোকসান দিতে হচ্ছে অনেক টাকা।
✦ পন্যের অধিক মূল্য। এখানে অনেক ধরনের ফসল, মাছ উৎপাদন হয়, কিন্তু উৎপাদন কারীরা মজুদ রাখতে না পেরে শহরে পাঠিয়ে দেয়। যার ফলে উৎপাদিত পন্যের দাম বাজার মূল্যর চেয়েও অধিক হয়ে পরে। তাই অনেক পরিবার চাহিদা পূরনে ব্যার্থ হয়।
✦ শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির চরম বাঁধা হচ্ছে বিদুৎ না থাকা। বর্ষার সময়ে আলো জ্বলে না প্রায় ঘরেই যার ফলে পড়ার অনেক ঘাটতি হয়। বিদুৎ না থাকায় স্কুল কলেজের কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব অচলের মত পরে রয়েছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের বাঁধাটা থেকেই যায়। আর শিক্ষা ব্যবস্থার এই দূরাবস্থার কারনে হাজারো মেধাবি শিক্ষার্থী তাদের স্বপ্ন জলাঞ্জলী প্রতিনিয়ত।
✦ যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তিত রাঙ্গাবালী লোকসমাজ। যাতায়াত ব্যবস্থা হচ্ছে একটি অঞ্চলের উন্নতি হওয়ার প্রধান হাতিয়ার। যে অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা যত ভাল সে অঞ্চল তত উন্নত। এই অঞ্চলের যাতায়াতের জন্য মটর-সাইকেল আর টমটমই একমাত্র ভরসা। বিদুৎ না থাকায় নেই কোন অটো রিকশা, মিনি বাস,‌পিক আপ ভ্যান ইত্যাদি মটর চালিত যানবাহন। যার জন্য যাতায়াত ভোগান্তি পোহাতে হয় মানুষের।
✦ চিকিৎসা সেবায় ভোগান্তি। জীবন আর চিকিৎসার সাথে সম্পর্কটা যেন রক্তের সম্পর্কের মত। চিকিৎসা হচ্ছে জীবনের চালিকাশক্তি। একজন অসুস্থ মানুষই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করতে পারে চিকিৎসার অভাব কি জিনিস। সেই অভাবটা সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করে আমাদের এই রাঙ্গাবালী সাধারন জনগন। ২১ শতকে এসে কি ভাবে মূল্যায়ন করবেন যে একটা উপজেলাতে কোন হাসপাতাল নেই। এর বড় একটা কারন হচ্ছে বিদ্যুৎ এর অভাব। মাঝে মাঝে ব্যাক্তি মালিকানাধীনে ডায়গানাস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু বিদুৎ সেবা না থাকাতে অতিরিক্ত খরচ দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে চালাতে দিতে হয় চিকিৎসা সেবা। যার খরচ হয়ে পরে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন। এখানকার মানুষের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না বলে বেশি খরচের চিকিৎসাটাও করাতে সক্ষম হয় না। দূর্গম অঞ্চল বলে আসে না ভালো মানের চিকিৎসকও। যার জন্য টিকে থাকে না ব্যক্তি মালিকানাধীন চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও। এর পেছনে বড় কারন হচ্ছে বিদ্যুৎ না থাকা। এর ভোগান্তি শুধু এই অঞ্চলের মানুষদেরই না বরং এখানে বাহিরের যত চাকুরীজীবি আসে সবাই। চিকিৎসার অভাবে দুনিয়া ত্যাগ করেছে শত শত সাধারন জনগন।
✦ সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভোগান্তি রাঙ্গাবালী। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া নিজেকে কল্পনা করা যায় না। বর্তমানে সকল কাজের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে চলমান বৈশ্বিক মহামারির সময়ে এর গুরুত্ব আগের তুলনায় দ্বিগুন হয়ে গেছে। কারন অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও এর সকল কার্যক্রম চলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আর এর জন্য প্রয়োজন মোবাইল, কম্পিউটার ইত্যাদি। আর এগুলো চালানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চার্জের ব্যবস্থা করা। চার্জের মাধ্যমেই এগুলো সচ্ছল থাকে। কিন্তু এই উপজেলায় বিদ্যুৎ সেবা না থাকার কারনে এই উপজেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভোগান্তির শেষ নেই। বর্ষার সময়ে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস চালানোটা কল্পনা করাও কঠিন। কারন বর্ষার সময়ে সূর্যের আলো থাকেনা অনেকদিন যার ফলে সৌর বিদ্যুৎ অচল হয়ে পরে। এসময় ৬০-৭০% মানুষের ঘরের সৌর বিদুৎ বন্ধ হয়ে থাকে।

দৈনন্দিন জীবনে এরকম আরো ভোগান্তির সম্মুখিন হয় এই উপজেলার মানুষেরা। যারা শহরে থেকে বিদুৎ সেবা নিয়ে থাকে তাদেরকে যদি ২-৩ দিন বিদুৎ সেবা না দেয়া হয় তাহলে তারা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তিটা উপলব্ধি করতে পারবে।

এই উপজেলায় কেন নেই বিদুৎ?
যখনই এই প্রশ্নটা করা হয় তখন এর একমাত্র উত্তর হয় উপজেলাটির ভৌগলিক অবস্থান। কারন এর তিন দিকে বড় বড় নদী আর একদিকে বঙ্গোপসাগর, যার ফলে অন্য জেলা শহর বা উপজেলা থেকে বিদুৎ সংযোগ আনাটা দুষ্কর ব্যাপার। এটাই এই উপজেলা বিদ্যুৎ না থাকার প্রধান কারন।

৯ বছরে কি সম্ভব ছিলো না?
রাঙ্গাবালী উপজেলা দেশের ৪৮৪ তম উপজেলা। উপজেলাটি ঘোষনা হয়েছে প্রায় ৯ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু এই উপজেলাতে কি পাওয়ার প্লান্ট তৈরী করে সেখান থেকে বিদুৎ সেবা দেয়া যেত না? অবশ্যই যেত কেননা এই উপজেলা হওয়ার পর অনেক জায়গায় পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করে বিদ্যুৎ সেবা পৌছে দিছে কিন্তু পাশ্ববর্তী জেলা শহর থেকে সংযোগ আনা যেত। তবুও পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করেছে কিন্তু আমাদের উপজেলাটা অন্য জায়গা থেকে সংযোগ আনা যায় না তবুও এখানে পাওয়ারপ্লান্ট স্থাপন করতে পারেনি।
প্রতিবছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে পরিমান বাজেট দেয়া হয় তাতে এই উপজেলায় বিদ্যুৎ সেবার ব্যবস্থা করা কোন কঠিন ব্যাপার ছিলো না।
আমরা যদি দেখি সুন্দরবনকে নষ্ট করে রামপালে যে পরিমান অর্থ খরচ করা হচ্ছে তার খুব সামান্য অংশ যদি হত তাহলেই এই উপজেলাতে বিদ্যুৎ সেবা অনেক আগেই চলে আসতে পারতো।

জানিনা কি কারনে হচ্ছে না, তবুও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে এই উপজেলাকে খুব শীগ্রই বিদ্যুৎ সেবার আওতায় আনা হয়। কারন এই উপজেলা আগামীর বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় স্থান।

জুনায়েদ
ছাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

গৌরব, আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাসের পদ্মা সেতু
মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, না মানলে শাস্তি
ডলারের বিপরীতে আবারও কমলো টাকার মান
ঈদ সামনে রেখে ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু ৬ জুলাই
পদ্মা সেতুর বুথ ব্যারিয়ারে বাসের ধাক্কা
খাবার নিয়ে বন্যার্তদের পাশে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ
বাড়ছে করোনা আসছে কঠোর নির্দেশনা!
মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু