২৫শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

রাস্তা সম্প্রসারণে গাছ কাটা, শতবছরের স্বাক্ষী ধ্বংসের অপরাধ

“বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে, মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে”- সহজে হয়তো জসীমউদ্দিন বলেছেন লাইনগুলো। কিন্তু এর মর্মার্থ বেশ গভীর। গ্রামের রাস্তার পাশে অবহেলা অযত্নে বেড়ে ওঠা বটগাছটি অবহেলার কথা মাথায় না রেখে,অযত্নের কথা মাথায় না রেখে, নিঃস্বার্থভাবে আজীবন ছায়া দিয়ে যায়। সেই ছায়ায় লুকানো মায়া কতটুকু মূল্যবান, তা বুঝা যায় লাইনটি দিয়ে। বন্ধুর মায়ার সাথে গাছের মায়ার মিশ্রণ গাছের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে নিয়ে গেছে আলাদা উচ্চতায়। এরকম হাজারটা গান, কবিতা রয়েছে গাছকে ঘিরে। যে গাছ আমাদের হাজারো উপকার করছে তাদের প্রতি আমরা কতটুকু যত্নশীল? উত্তরে আমাদের ঋণাত্মক পাল্লাই ভারী হবে।

অযত্নের একটি দিক হচ্ছে রাস্তার পাশের গাছ কাটা। রাস্তার পাশের গাছগুলো মূলত অবহেলায়ই বড় হয়। যত্ন না থাকায় শত শত গাছের মধ্যে টিকে থাকে গুটিকয়েক। কিছু কিছু হয়ে ওঠে শতবর্ষী। শত ঘটনার সাক্ষী হয়ে, লক্ষ কোটি মানুষের পথ চলার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে বেঁচে থাকা গাছগুলো, কাটা পড়ে মানুষের উদাসীনতার জন্যে।
কিন্তু উন্নয়নের দোহাই দিয়ে, রাস্তা সম্প্রসারণের কথা বলে, প্রায় সময়ই কেটে ফেলা হচ্ছে শতবছর পুরনো গাছ।
কাটার সময় প্রায়ই মানা হয়না সরকারি নিয়ম কানুন। সাধারণ মানুষের চোখে যেটি ভুল মনে হয়, অসাধারণ চোখগুলো নির্দ্বিধায় সেগুলো মেনে নিচ্ছে। প্রায় সময় গাছ কাটার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের মানববন্ধন দেখা যায়। এর মানে দাঁড়ায়, সাধারণ মানুষ এর মূল্য বুঝে। আর হর্তাকর্তারা কি এর মানে বুঝেনা? নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে? যদি না বুঝার ভান করে তাহলে এর পেছনে স্বার্থ কি? এটা কি গাছ কাটার জন্য উন্নয়নের পায়তারা নাকি উন্নয়নের জন্য গাছ কাটা? উত্তর যাই হোক গাছ কাটা সমর্থনযোগ্য নয়।

উল্লেখ্, ২০১২ সালে, গাছ কাটলে-জেল জরিমানার বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। উক্ত বাক্যের বিলের ৪ ধারার ২ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, সরকার যদি সংরক্ষণযোগ্য কোন গাছ কাটার অনুমতি দেয় তবে শর্ত হিসেবে একটি গাছ কাটলে তিনটি গাছ লাগাতে হবে। এরকম আইন রয়েছে ভারতেও। ফ্ল্যাট তৈরির উদ্দেশ্যে গাছ কাটলে একটি গাছের পরিবর্তে তিনটি গাছ লাগাতে হবে। রাস্তার পাশের গাছ কাটলে একটির পরিবর্তে পাঁচটি গাছ লাগানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের আইনের বাস্তব প্রয়োগ নেই। এ ধরনের আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ কিছুটা হলেও গাছের অভাব কমাবে।

এদিকে গাছের অভাব কিছুটা অনুমিত ঢাকা শহরে। গাছের অভাব ঢাকা শহরে কতটুকু তা টের পাওয়া গ্রীষ্মের দুপুরে রাস্তা দিয়ে হাঁটলে। গ্রামের রাস্তায় প্রচন্ড গরমে চাইলে গাছের ছায়ায় একটু জিরিয়ে নেয়া যায়। এতে শরীরে আসে নতুন কর্মশক্তি। কিন্তু ঢাকা শহরে রাস্তার পাশে গাছের দেখা মেলা মানে রীতিমতো কঠিন বিষয়। আস্তে আস্তে আমাদের অব্যবস্থাপনার কারনে, জেলা শহর থেকে শুরু করে মফস্বল শহরের রাস্তাগুলোও গাছহীনতায় ভুগবে। সেদিন খুব একটা দূরে নয়। এখনই সময় সঠিক বন নীতি প্রণয়ন করার। শুধু প্রণয়ন করলেই হবেনা, দরকার সঠিক বাস্তবায়ন।

এ বিষয়ে যমুনা টেলিভিশনের একটি খবর না বললেই নয়৷ এক মহিলা অন্য মহিলার ছাদের গাছ কেটে ফেলার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সেই মহিলাকে গাছের চারা উপহার দিতে আসে। সেই সাথে তারা এমন ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করার পাশাপাশি আইনগত সমাধানও চায়। কিন্তু রাস্তার পাশের শতবর্ষী গাছগুলো রাখার বিষয় ততোটা আগ্রহ আমরা দেখতে পাই না। উন্নয়ন আমাদের অবশ্যই দরকার তবে সেটা ক্ষতি করে নয়। গাছগুলো আমাদের কতবড় সম্পদ সেটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বরং সম্পদ ক্ষতি না করে কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। একটি গাছ কেটে ১০ টি গাছ লাগালেও কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারবেনা যে ১ টি গাছও শতবর্ষী হবে।
সুতরাং গাছ না কাটার শতভাগ চেষ্টা রেখেই আমাদের রাস্তা সম্প্রসারণ করা উচিত। আমার বাবার হাতের লাগানো গাছ আমি যেমন কোন যুক্তিতে কাটতে পারিনা, ছায়ানটের গাছগুলো যেমন কোন যুক্তিতে কাটা যায় না তেমনি রাস্তা সম্প্রসারণের যুক্তি দেখিয়ে শত বছরের সাক্ষীগুলো এভাবে ধ্বংস করা যায় না। এ যেন প্রকৃতি ধ্বংসের অপরাধ।

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

শপথ নিন সাংবাদিক নিপীড়কদের সাথে কোন আপোষ করবোনা
প্রাকৃতিক দুর্ভিক্ষ নয় রাজনৈতিক দুর্ভিক্ষই বিশ্বব্যাপী জীবন মানবতার মহা সংকট
পরিবার থেকেই ঘটছে শিশু সহিংসতা
করোনা ভ্যাকসিন পরিস্থিতি
কোভিড ১৯ ও বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থা
শেখ হাসিনার কৌশলী নেতৃত্বেই করোনা মোকাবেলায় সফল বাংলাদেশ
করোনার ভুয়া রিপোর্ট: বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের
বিশ্বের চিকিৎসা ইতিহাসে নতুন আতঙ্কের নাম বাংলাদেশ! ফ্লাইট বন্ধ করে দিচ্ছে বিদেশিরা