যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

কোন মানুষের শরীরে রোগ বাসা বাঁধলে সেই রোগের ছাপ ফুটে উঠে চেহারায়। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে মানুষ। এর জন্য আমাদের প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মনের অসুখ হলে কাকে দেখাবে ? কোন ডাক্তারকে দেখাবে? মনের অসুখ কী আসলেই কোন অসুখ? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের মনে শেষের প্রশ্নটাই বেশি আসে। এখনো বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে নি। তাই, এই প্রশ্ন এখনো শুনতে হয়।

‘মন’ বিষয়টিকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। মন বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যে, বুদ্ধি এবং বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। জড়বাদী দার্শনিকগন মনে করেন যে, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে উঠে।

দর্শনের এরকম আরো নানারকম তত্ব আছে। আমরা বিজ্ঞান, দর্শন এক পাশে রেখে যদি খালি চোখেও যদি তাকাই তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীতা আরো স্পষ্ট করে দেখতে পাবো। আমাদের চারপাশে আত্মহত্যার রোল উঠেছে বেশ কয়েকমাস ধরে। তাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এরকম খবর দেখতে দেখতে এক রকম বিষন্নতায় ভুগছে এখন অন্যরা!আমাদের সমবয়সী কিংবা এক-দুই বছরের বড় কেউ অনায়াসে বিদায় জানিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীকে। কিন্তু কেনো? মানসিক অবসাদগ্রস্ততা আত্মহত্যার প্রধান কারণ হতে পারে। এছাড়া, আত্মহত্যার আরো কারন থাকতে পারে। প্রেম ঘটিত কারন, পারিবারিক অশান্তির ফলে মানুষ একা একা থাকতে শুরু করে তখনই তাকে পেয়ে বসে মানসিক অবসাদ। এক সময় একা একটা ঘরে হারিয়ে যায় চিরকালের জন্য! এই হারিয়ে যাওয়া কাম্য নয়। প্রত্যেক সন্তানই তার মা-বাবার কাছে প্রিয়। ছোট বেলা থেকে লালন-পালন করে একটা মাংসের স্তূপকে মানুষে রূপ দেয়ার কারিগররা যখন ক্লান্ত, জীবনের শেষ বয়সে এসে উপস্থিত হয় তখন সেই সন্তাকেই কাজে লাগে। কিন্তু আফসোস সে সময়ই অনেকে মা-বাবার বুকের উপর বিশাল ভারী একটা লাশ চাপিয়ে দিয়ে চলে যায়!

কবি জীবনানন্দ দাশকে বুদ্ধদেব বসু নির্জনতম কবি বলেছেন। এই কবিকে এক সময় প্রগতিশীল লেখকরা তাদের দলে নিতে চাইতেন না। জীবনানন্দের প্রতি তাদের অভিযোগ, জীবনানন্দ আশাবাদী কবিতা লিখেন না। তাই, তাকে প্রগতিশীল বলা যাবে না। সেই জীবনানন্দের কবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘আট বছর আগের একদিন।’ এই কবিতার বাখ্যা বিশ্লেষণ এখনো চলছে, সামনেও চলবে হয়তো! ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় জীবনানন্দ একটা লোকের আত্মহত্যার কথা তুলে ধরেছেন।

লেখক শাহাদুজ্জামান তার বই ‘একজন কমলালেবু’তে ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার বাখ্যায় কবিতার লোকটিকে গৌতম বুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, কবিতার সেই লোক গৌতম বুদ্ধের মতোই সাংসারিকতার ভেতর থেকেই নতুন জীবন লাভের জন্য গেছেন অশ্বথ তলায়। গৌতম বুদ্ধ গিয়েছিলেন ধ্যানের মাধ্যমে নতুন জগৎ আবিষ্কার করতে আর লোকটা মরে গিয়ে নতুন জীবনের খোঁজে। নতুন জীবন পাবে এই চিন্তা এসেছে এই জন্য যে কবিতায় উল্লেখ আছে তার মরার স্বাদ জেগেছিলো শুল্কা পঞ্চমীর রাতে। তার পরের দিন ষষ্ঠী। সনাতন ধর্ম মতে, ষষ্ঠী শিশুদের দেবতা, তিনিই নবজাতককে সৃষ্টি করেন এবং পালন করেন। কবিতার মানুষটা এক নতুন জীবন সৃষ্টির জন্য এক গাছা দড়ি নিয়ে অশ্বথ গাছের নিচে গিয়েছে বুদ্ধের মতো।

তবে, এই কবিতায় জীবনানন্দ লোকটার আত্মহত্যার ইচ্ছাটাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিতও করেছেন। তিনি বলছেন, থেতলে যাওয়া ব্যাঙের কথা, দুষ্ট ছেলের হাতে ধরা পড়া ফড়িংয়ের কথা, অন্ধ পেঁচার কথা; যারা এত কষ্টের পরও কিংবা জীবনের প্রতিকূলতার পরও দুই মুহূর্ত আরো বেশি বাঁচতে চায়। জীবনে নানারকম সমস্যা আসবে সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠে এগিয়ে যেতে হবে। এই সুন্দর জীবন তো মাত্র একবারই পাওয়া যাবে! পৃথিবীতে এত আশ্চর্যজনক জিনিস আছে, এত সুন্দর জিনিস আছে এগুলোতে দেখতে হবে। এই বিষয় নিয়ে জীবনানন্দ কবিতার লোকটাকে প্রশ্ন করেছে, যখন সে মরতে যায় তখন কি তার জোনাকির গান, যবের খেতগুলো তাকে টানে নি? এত সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে সেই মর্গই কি তাকে বেশি টেনেছে?

এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজলে হয়তো যারা আত্মহত্যা মতো নিষ্ঠুর কাজ করেছে তারা হয়তো এ কাজ করতো না। মৃতদের জীবন ‘মৃত’ শব্দটির মতো এক দীর্ঘশ্বাস মনের কোণে এক ব্যথা বোধের নাম। যারা আত্মহত্যা করেছে তারা কেনো করেছে, কোন পরিস্থিতিতে করেছে সে বিষয়ে থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে হবে। যেখানে মানুষ দেখা পাবে দোয়েলের জীবনের সাথে, ফড়িংয়ের জীবনের সাথে। তাতে, মানুষের বাঁচার আগ্রহ আরো বাড়বে।

শনিবার(১০ অক্টোবর) বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এই দিবস মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই দিবস পালন করা হয়। এবারও হয়তো করোনা সময়ে সীমিত আকারে পালন করা হবে। তবু পালিত হোক, মানুষ সচেতন হোক, মনের অসুখ যে হয়েছে সেটা বুঝুক, চিকিৎসা করাতে আগ্রহী হোক। কবি জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত লাইনের(যে জীবন ফড়িংয়ের- দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকে দেখা এই জেনে) ফড়িংয়ের জীবন, দোয়েলের জীবনের সাথে মানুষের যেনো দেখা হয় এ জনমে।

ইকবাল হাসান
বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

ফেনীর ৫ পৌরসভার মেয়র পদে আ’লীগ প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত
মুরাদনগরে অগ্নিকাণ্ডে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত
নোয়াখালীতে স্কুল ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার
দাগনভূঞায় পৌরসভা নির্বাচনে ৩ আওয়ামীলীগ প্রার্থীর নাম ঘোষণা
পটিয়ায় খাজা বাবা ও শানে জামে আওলিয়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত
লালমনিরহাটে ট্রেনে কাটা পড়ে ২ জনের মৃত্যু
লক্ষ্মীপুরে হানাদারমুক্ত দিবস পালিত
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গলাকাটা যুবকের লাশ উদ্ধার