১লা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ |

শস্য চিত্রে বঙ্গবন্ধু: গিনেসের শর্তগুলো মানা হয়েছে শতভাগ

মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় ১০০ বিঘা জমিতে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলতে ধানের চারা রোপণ করা হয় প্রায় এক মাস আগে। সেই চারাগুলোতে এখন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে।

মঙ্গলবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মনোনীত দুই প্রতিনিধি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সন্তোষ প্রকাশ করে তারা জানালেন, এখানে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের শর্তগুলো শতভাগ মেনেই বঙ্গবন্ধুর এই প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে এই শস্য চিত্র পরিদর্শন করেন শের-ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক এমদাদুল হক চৌধুরী। তারা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মনোনীত প্রতিনিধি।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু, সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু, ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

শস্য চিত্র পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠিয়ে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চল (বগুড়ার শেরপুরে) পরিদর্শন করে ক্রপ মোজাইকের ওপর কী পরিমাণ কাজ করা হয়েছে। কোন ধরনের শস্য ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বিষয়গুলো দেখে সঠিক প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠাতে।

সাইট ভিজিট করে দেখা গেছে, এই অঞ্চলে বৃহত্তর আঙ্গিকে সঠিকভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে। সার্ভে করে দেখা গেছে, এটার আয়তন ৪০০ বাই ৩০০ মিটার। এর বাহিরেও আরো জায়গা রয়েছে। গিনেজ ওয়ার্ডের রেকর্ডের সবগুলো নির্দেশনা পরিপূর্ণভাবে মানা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করার মতো অবস্থা রয়েছে।

এই অধ্যাপক আরো বলেন, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের শর্তে বলা হয়েছে, দুটি ভিন্ন রংয়ের শস্যের ব্যবহার থাকতে হবে। এখানে তার পূর্ণতা এসেছে। শস্যের ৪০ ভাগ হবে বেজ। আর ৬০ ভাগ হতে হবে মূল ইমেজ। এই শস্যচিত্রে সেই বিষয়টি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দুটি রংয়ের শস্য ব্যবহার করা হয়েছে। শস্যের যে ঘনন্তের কথা উল্লেখ রয়েছে; তাও পরিপূর্ণভাবে মানা হয়েছে। শস্য চিত্রে কোনো কৃত্রিম রং ব্যবহার করা যাবে না; এখানে টোটালি প্রাকৃতিকভাবে শস্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। রেকর্ড সৃষ্টির একটি চিত্র হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বব্যাপী রেকর্ড ভঙ্গকারী একটি অনন্য ক্যানভাস তৈরি করতে যাচ্ছে।

সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এই প্রতিনিধি দলের প্রধানও। শের-ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, শস্য চিত্রে সেভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তার সঙ্গে স্কেচের তৈরি বঙ্গবন্ধুর শতভাগ মিল রয়েছে। স্কেচের সঙ্গে দেয়া বঙ্গবন্ধুর রংয়ের শতভাগ মিল রয়েছে। শস্যের ভ্যারাইটিও রয়েছে নির্দিষ্ট স্থানে সুনির্দিষ্টভাবে। ড্রোন থেকে তোলা ছবিও শতভাগ ঠিক আছে।

তিনি আরো বলেন, এটি একটি ক্রপ ফিল্ড মোজাইক। এখানে কোনো কৃত্রিমতা থাকবে না। কোনো কৃত্রিম কালার সংযোজন করা যাবে না। এখানে প্রাকৃতিকভাবেই বঙ্গবন্ধু ফুটে উঠেছে। গিনেচ রেকর্ডে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থান পেতে হলে শস্যের ৪০ ভাগ হবে বেজ, আর ৬০ ভাগ হতে হবে মূল ইমেজ। সেটি ঠিক আছে কিনা তার সঠিক তথ্য দিবেন সার্ভেয়ার। তবে আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সব ঠিক আছে। এই শস্য চিত্র দেখে আমি শতভাগ সন্তোষ প্রকাশ করছি। আজকের প্রতিবেদন আমরা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্রিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেব। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নিবে।

শস্য চিত্রের এই প্রকল্প জরিপ করছেন শেরপুর উপজেলা প্রশাসন। এই দলের দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা সার্ভেয়ার হাবিবুল ইসলাম বাবলু।

তিনি বলেন, প্রকল্প এলাকায় ৬ জনের একটি দল পরিমাপ করছে। জমি জরিপের ডিজিটাল যন্ত্র দিয়ে পরিমাপ করা হচ্ছে। সঠিক তথ্য পেতে আরো তিন থেকে চারদিন সময় লাগবে।

গত ২৯ জানুয়ারি এই প্রকল্পের চারা রোপণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকব আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক।

মঙ্গলবার প্রকল্প এলাকা পরির্দশন করে নাছিম বলেন, শস্য চিত্রে বঙ্গবন্ধু; এটি ভিন্ন ধরনের ভিন্ন মাত্রার একটি কর্মসূচি। এর মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ব দরবারে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরা হবে। সারা বিশ্বকে জানাতে চাই বাংলাদেশ জাগ্রত হয়েছে। নান্দনিক ছবির মাধ্যমে জাতির জনকের প্রতিকৃতি তুলে ধরা হবে।

জাতির জনত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গঠিত জাতীয় পরিষদের উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার নামে একটি প্রাইভেট কোম্পানির অর্থায়নে প্রতিকৃতিটি তৈরি করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের সদস্য সচিব কৃষিবিদ কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, প্রতিকৃতিতে বঙ্গবন্ধুকে গিনেস বুকে স্থান দেয়ার জন্য গত বছরের মার্চ মাস থেকে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু কর্মসূচির কাজ শুরু করা হয়। বেগুনী ও সবুজ রঙের ধানগাছে ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। চায়না থেকে বেগুনী রঙের ধানের জাত (এফ-১) আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ শস্যচিত্র হিসেবে রেকর্ড গড়ার জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আজীবন লড়াই করেছেন মানুষের ভাত-কাপড়ের অধিকার ও কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতষ্ঠার জন্যে। তাই দুই রঙের ধান গাছই বেছে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকার জন্যে। বেগুনী রঙের ধান ব্যবহার করে আঁকা হয়েছে জাতির পিতার বিশাল প্রতিকৃতি। ফিল্ড ট্রায়াল সম্পূর্ণ করা জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ কর্মসূচির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ১০০ বিএনসিসি ক্যাডেটকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এ কাজের জন্য তৈরি করা হয়।

গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সর্ববৃহৎ শস্যচিত্র ২০১৯ সালে চীনের তৈরি করা। যার আয়তন ছিল ৭৫ বিঘা। ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার কৃর্তপক্ষের দাবি, বগুড়ায় প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ফুটে উঠবে। এটিই একক ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি।

এই প্রকল্পে তিন বিঘা জমি ইজারা দিয়েছেন একই গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। বাস নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন ঘুরতে এসে অনেক খুশি। আগে বুঝতে পারিনি ধানের মধ্যে দিয়ে মানুষের ছবি দেখা যাবে। তাও আবার বঙ্গবন্ধুর ছবি। আমি অনেক খুশি জমিতে এমন চাষ দেখে। সাধারণভাবে এই ছবি দেখা যাচ্ছে না। তবে পাখির মতো উপর থেকে দেখা যাচ্ছে ক্যামেরার মাধ্যমে।

আয়োজকরা জানান, ১-১৬ ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০ জন নারী শ্রমিক কাজ করেছেন। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন পুরুষ শ্রমিক। তাদের সমন্বয়ে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

তারা আরো জানান, এর আগে ১৩ রেজিমেন্টের বিএনসিসির ১০০ জন করে সদস্য প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। একদল শুকনো জমিতে প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছে। আরেকদল কাঁদা জমিতে লে-আউট তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে বগুড়ার আজিজুল হক সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান, সরকারি শাহ সুলতানসহ আরো অনেক শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণ করে। পরে নকশার দায়িত্ব পায় এক্সপ্রেশন লিমিটেড নামে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। এই ১০০ বিঘা জমি স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি বিঘা জমি ৯ হাজার টাকায় সাত মাসের (নভেম্বর থেকে মে) জন্য ইজারা নেয়া হয়। এই ফসল উঠে গেলে কৃষকরা আবার তাদের জমি ফেরত দেয়া হবে।

প্রকল্পটির ব্যবস্থাপক এবং ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ারের কর্মকর্তা কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু একটা ইউনিক প্রজেক্ট। জাতীয় কমিটির মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। মূল উদ্দেশ্য হলো শস্যচিত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করা। এর পাশাপাশি এই শস্যচিত্রটি গিনেস বুকে অন্তভূক্তি করার প্রচেষ্টা। গিনেস কর্তৃপক্ষের সবগুলো শর্ত মেনেই এই প্রকল্প করা হচ্ছে।

কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে শস্যচিত্রটি পরিপূর্ণ হবে। তখন ড্রোন দিয়ে ছবি তুললে শস্যচিত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি পুরোপুরি দেখা যাবে। শস্যচিত্র পূর্ণ হলে তথ্য-উপাত্ত গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

(Visited ৩৯ times, ১ visits today)

আরও পড়ুন

‘৫ বছরের মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি মডেল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিবে’
মুক্তি পেল পদ্মা সেতু নিয়ে তাহসিন খানের গান
পরিকল্পিত পর্যটন শিল্প ও পদ্মাসেতু
‘বিশ্ব নন্দিত এক নক্ষত্র শেখ মুজিবুর রহমান ’ গ্রন্থের মোড়ক উম্মোচন
ওমিক্রন ঠেকাতে স্বাস্থবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই: ডাঃ আয়েশা আক্তার
দেশে করোনায় মৃত্যু বাড়ল
এসে গেল বিজয়ের মাস
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন পেয়েছে জাগ্রত মানবিকতা