১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

হার্ট অ্যাটাক !!!

অভিজিৎ সরকার জ্যোতি
এম বি বি এস (মুগদা মেডিকেল কলেজ,ঢাকা )

হার্ট নিজে একটি পাম্প এর মত , অনবরত আমাদের দেহে রক্ত পাম্প করাই তার প্রধান কাজ ।আমরা জানি শরীরের যে কোন অঙ্গের সঠিক কাজ এর জন্য প্রয়োজন বিরামহীন রক্ত সরবরাহ।কারণ রক্ত এর মাধ্যমেই মূলত আমাদের শরীরের কোষগুলু পুষ্টি সরবরাহ পেয়ে থাকে । আর তাই হার্টের ও নিজস্ব একটি রক্ত চলাচলের পদ্ধতি রয়েছে, রক্তনালি আছে। এই রক্তনালিগুলোর মধ্যে কোনো একটি বা একের অধিক নালি যদি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হার্টের বেশ কিছু অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের কাজ করার ক্ষমতাও বন্ধ হয়ে যায়। এটিই হলো হার্ট অ্যাটাক। মূলত, রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হার্টের কার্যক্ষমতা যে বন্ধ হয়ে গেল, সেটিই হলো হার্ট অ্যাটাক।

কিভাবে হার্ট অ্যাটাক হয় ?
হার্ট এর রক্ত নালি গুলোর মাঝে কোন একটি কিংবা এক এর অধিক রক্তনালির প্রাচীর যদি চর্বি যমে কিংবা শরীর এর কোন অংশ থেকে রক্ত জমাট বেধে সেই জমাট বাধা রক্ত এর দলা দিয়ে বন্ধ হয়ে যায় তখন সেই রক্তনালি দিয়ে হার্ট এ রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ।তখন ই পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে হার্ট এর ওই অঞ্চল এর কোষ গুলি মারা যায়।

হার্ট অ্যাটাক এর লক্ষণ
চিকিৎসক দের জন্য হার্ট আটাকের লক্ষণ চেনা যেমন জরুরী ঠীক তেমন সাধারণ মানুষের জন্য ও হার্ট অ্যাটাক এর লক্ষণ চেনা খুব জরুরী ।

সাধারণত বুকে ব্যথা হার্ট অ্যাটাক এর সবচেয়ে প্রচলিত লক্ষণ। হঠাৎ করে বুকটা ভীষণ চেপে ধরে। মনে হয় বুকটি ভেঙ্গে পড়ল। অনেক ওজন চেপে গেছে। এটা হয় শুরুতে এবং এর সাথে সাথে অনেকের শরীরে ঘাম হতে থাকে। পাশাপাশি অনেক সময় মাথা ঘুরতে থাকে, বমি হতে থাকে। আবার বমি নাও হতে পারে। তবে বুকে ব্যথা হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।তার হয়তো আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো রোগ ছিল, সেখান থেকে হার্ট অ্যাটাক হলো। এগুলোই তার প্রধান উপসর্গ।
লক্ষ্ণসমূহ বুঝতে হলে আমাদের হার্ট অ্যাটাকের বুক ব্যাথার ধরণ সমর্কে স্পস্ট বুঝতে হবে । যেমণ – ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ বা হার্ট অ্যাটাক এ বুক ব্যাথার ধরণ গুলো নিচে ছক আকারে বর্ণণা করা হলো –

ব্যাথার স্থান বুকের মধ্যখানে কিংবা বুকের বাম পাশে
ছড়িয়ে যাওয়া চোয়াল,ঘাড়,কাধ কিংবা বাম পাশের বোঁগল সহ বাম হাত
ব্যাথার ধরণ মনে হয় বুকের উপর শক্ত ভারী পাথর রাখা ,বুক চাপ দিয়ে ধরে আছে , এই বুঝি বুকটা ভেঙ্গে
পড়ল ।
বুক এর ভিতর পিন প্রিকিং টাইপের ব্যাথা -মানে কেউ কোন ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুকের ভিতর ছিদ্র
করে দিচ্ছে –এমন টা নয় ।

কি কি করলে বাড়ে ? কোন ভারী কাজ করলে এমন কি দৌড়ালে বা উচু সিড়ী উঠানামা করলে
কিভাবে আরাম পাওয়া যায় ? বিশ্রাম এবং নাইট্রেট ঔষধ এর প্রতি কুইক রেস্পন্সে
আনুষঙ্গিক সমস্যা কি ? ঘাম,বমি বমি ভাব ,বমি এবং শাসকষ্ট

স্বাভাবিক হার্ট – বুকের বাম পাশে
ডেক্সট্রোকার্ডিয়া -যাদের হার্ট বুকের ডান পাশে

হার্ট এটাক এ টিপিক্যাল বুক ব্যাথার ধরণ

কারণ –হার্ট অ্যাটাক এর জন্য কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর দায়ী ।যেমন –
ধূমপান
অতিরিক্ত কোলেস্টেরল
অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত মদ পান
ডায়াবেটিস
অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা
কিছু স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ – যেমন জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি

হার্ট অ্যাটাক হলে কি করণীয় ?

উপরে উল্লিখিত লক্ষণ যদি আপনার মাঝে দেখা যায়, আপনি ৯০ ভাগ নিশ্চিত হতে পারেন এখানে হার্ট অ্যাটাকের প্রক্রিয়া চলছে। সেই সময় সঙ্গে সঙ্গে এসপিরিন ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। এটি ৩০০ মিলিগ্রামের পাওয়া যায়- এটি খাওয়াতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।এর কারণ প্রাথমিক চিকিৎসার মধ্যে প্রথম চিকিৎসা হলো, ব্যথাটাকে কমানো এবং সম্ভব হলে দ্রুত ইসিজি করে রোগ নির্ণয় করা। এর আরো একটি কারণ হলো, যত তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পৌঁছাবে তত তাড়াতাড়ি তার চিকিৎসা শুরু হবে। আর যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু হবে, তত তাড়াতাড়ি হার্টের একটি বড় অংশ বাঁচানো সম্ভব হবে।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ

এটি খুব জরুরি ব্যাপার। এর কারণ হলো, এটি কোনো জীবাণুঘটিত রোগ নয়। যেমন : কলেরা, টাইফয়েড- যেই জীবাণুঘটিত রোগ।জীবাণু শনাক্ত করলেন, জীবাণু ভালো হয়ে গেল-এখন আর ওষুধ দরকার নেই -হার্ট অ্যাটাক এর ক্ষেত্রে এমন ভাবার অবকাশ নাই ।কারণ এটী আগা গোড়াই একটি নন কমিউনিকেবল ডিজিজ। তবে এসব রোগে ওই ধরনের কোনো চিকিৎসা নেই। যেহেতু এই রোগের নিরাময় নেই, তাই একে প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।এটা দেখা গেছে যে বেশ কিছু কারণ রয়েছে যেটি হার্ট অ্যাটাককে তৈরি করতে সাহায্য করে। যেমন : কারো উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। যার অনেক বেশি ওজন, বেশি চলাফেরা করে না। অফিসে বসে বসে কাজ করে। কোলেস্টেরল বেশি। অথবা পারিবারিক ইতিহাস খুবই খারাপ। আগে মা-বাবা বা কারো হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। সুতরাং এই দলকে আমরা বলি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দল। তাদের শুরু থেকেই এই বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাকে ওষুধ খেয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আর যদি কারো ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে থাকে সেটি আরো বেশি ক্ষতিকর।যাদের বেশি ওজন, তাদের কমিয়ে ফেলতে হবে। আর খাওয়ার বিষয়ে খুব খেয়াল রাখতে হবে। প্রাণীজ চর্বি থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। তাহলে হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা যায়।

যার পরিবারে হার্ট অ্যাটাক ছিল কারণ, তারও এক সময় হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাহলে হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে পারব।

প্রতিরোধ এর জন্য সর্বোপরি আমাদের ২টি স্ট্রাটেজি অনুসরণ করতে হবে ।

স্ট্রাটেজি১ঃ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
১।চর্বিযুক্ত খাবার যথা সম্বব এড়িয়ে চলতে হবে ।
২।খাদ্যের মধ্যকার ডায়েটারি কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ( প্রতি ১০০০ কিলোক্যালরি খাদ্যে এর মান কখনই ১০০ মি গ্রা এর বেশি হওয়া যাবে না )
৩। ধূমপান এবং মদ্যপান প্রতিরোধ করতে হবে ।
৪। অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
৫। অতিরিক্ত লবণ খাওয়া পরিত্যাগ করতে হবে ।
৬। নিয়মিত হাটা চলা এবং ফিজিক্যাল এক্টিভিটির অভ্যাস করতে হবে ।

স্ট্রাটেজি২ঃ ঝুকিপূর্ণ গোষ্ঠী যেমন – যাদের হার্ট অ্যাটাক এর পারিবারিক ইতিহাস আছে কিংবা যারা উচ্চ রক্তচাপ,ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরল এর রোগী ; তাদের ক্ষেত্রে –
১।চর্বিযুক্ত ও অধিক কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার পরিপূর্ণ ভাবে পরিহার করতে হবে ।
২।ধূমপান এবং মদ্যপান প্রতিরোধ করতে হবে ।
৩।অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
৪।অতিরিক্ত লবণ খাওয়া পরিত্যাগ করতে হবে ।
৫।নিয়মিত হাটা চলা এবং ফিজিক্যাল এক্টিভিটির অভ্যাস করতে হবে ।
৬।ব্লাডসুগার,ব্লাডপ্রেসার নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে এবং ডাক্তার এর পরামর্শ মোতাবেক ট্রিট মেন্ট নিয়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে হবে ।

কেন প্রতিরোধ এর কথা বার বার বলা হয় ?
হার্ট অ্যাটাক মানে হলো হার্টের পেশির অংশ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।যদি হার্টের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, চিকিৎসা হওয়ার পর সে সুস্থ হয়ে উঠলেও ওই অংশটুকু কিন্তু নিরাময় হবে না। সুতরাং প্রতিরোধ করাটা সর্বোত্তম পদ্ধতি এবং আমাদের মতো গরিব দেশে তো এটা অবশ্যই দরকার।

চিকিৎসা পদ্ধতি
সাধারণত দুই ভাবে হার্ট অ্যাটাক এর চিকিৎসা করা হয় ।যথা –
১।কনভেনশনাল কনজারভেটিভ পদ্ধতি – এই পদ্ধতিতে মূলত ঔষধ এর মাধ্যমে চিকিতসা করা হয় এবং জীবন যাত্রার ধরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় ।
২।সার্জারী- যখন কনভেনশনাল কনজারভেটিভ পদ্ধতিতে চিকিতসার পরও হার্ট এটাক এর ঝুকি থাকে তখন এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় ।
এঞ্জিওপ্লাস্টি যা মূলত হার্ট এ রিং পরানো নাম এ পরিচিত ।এখানে মূলত সার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনী এর মাঝে একটি রিং পরিয়ে দেন যাতে রক্তচলাচল সচল থাকে এবং পুনরায় সেখানে আর ব্লক না হয় ।

করোনারি বাইপাস সার্জারী – এখানে চিকিৎসক শরীর এর পা বা অন্য কোন স্থান থেকে ধমনী কেটে এনে বন্ধ হয়ে যাওয়া করোনারি ধমনীর সাথে লাগিয়ে একটি বাইপাস রুট তৈরি করে দেন যাতে করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক্ থাকে ।

—- সবার জানা প্রয়োজন —-

হার্ট অ্যাটাক হলে উপযোগি চিকিৎসা নিতে হবে ,অনেক এর মাঝেই রিং পরানো কিংবা বাইপাস সার্জারী নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আছে ।এগুলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।নিয়ম মাফিক জীবন যাপন করলে সার্জারীর পর মানুষ দীর্ঘদিন সুস্থ ভাবে বেচে থাকতে পারে ।এবং এই ধরনের সার্জারী তে সফলতার পরিমাণ সন্তুষ্টজনক ।

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন চিশতী’র ৩৯ তম জন্মদিন আজ
ইসরায়ীলী আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে বিশ্ব সুন্নী আন্দোলনের মানববন্ধন
পবিত্র আল আকসা মসজিদে মুসল্লিদের নৃশংস হামলার প্রতিবাদে ইমাম হায়াতের বিবৃতি
ইমাম হায়াতের সভাপতিত্বে রাজধানীর গুলশানের একটি হলে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত দিবস পালিত
অল্প সময়ে মানুষের মন জয় : ওসি ইমতিয়াজের
নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ।
ঈদে মেরাজুন্নবী উদযাপনে ফেনীতে বিশ্ব সুন্নী আন্দোলনের সমাবেশ ও আনন্দ শোভাযাত্রা
মহান ঈদে মেরাজ শরীফ রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষনার দাবিতে ওয়ার্ল্ড সুন্নী মুভমেন্টের মানববন্ধন