১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |

সাংবাদিক বিদ্বেষ ও কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার!

দীর্ঘ লেখা , অনেকেই পড়বেন না হয়তো। কেউ এড়িয়ে যাবেন, কেউ না পড়ে রিয়্যাক্ট দিবেন আবার কেউ খুঁজবেন একটা পয়েন্ট যেটাতে দ্বিমত করে সুখ পাওয়া যায়। তবুও লিখছি।

বাংলাদেশে এখন কি চলছে? “সাংবাদিক বিদ্বেষ”। সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচুর গালমন্দ করতে দেখছি সাংবাদিকদের। কেউ কেউ হতাশা থেকে করছেন কেউ কেউ রাজনৈতিক মোটিফে। এই বিদ্বেষ যথার্থ কি অযথার্থ তা নিয়ে শুরুতেই সমাপ্তি টানার মতো তাড়া আমার নেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেরিডার Deconstruction পড়াই তাই এটা ভালো করেই জানা আছে ” তর্কের উল্টো পিঠেও যুক্তি থাকতে পারে। আর আমি কখনো কারো মন যোগাতে লেখি না। অত জনপ্রিয় মানুষ আমি না (হতেও চাই নি কখনো) যে অপ্রিয় কথা বলে ফ্যান -ফলোয়ার হারাবো।

সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিদ্বেষের কারণগুলো কী কী?
১. ক্যান্সারের মতো বেড়ে ওঠা অংসখ্য গণমাধ্যম, যা থেকে হরহামেশাই হলুদ সাংবাদিকতার চূড়ান্ত দেখা যায় ২. মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশি ভিউ পাওয়ার লোভে সংবাদের শিরোনাম ও মানের সাথে আপোস। ৩. স্পর্শকাতর সংবাদ প্রচার করে এক শ্রেনীর অনুভূতিতে আঘাত দেয়া ৪. ক্ষেত্র বিশেষে নীরব বা পক্ষপাতমূলক ভুমিকা পালন ।

এই ৪টির বাইরেও কিছু কারন থাকতে পারে তবে মূলত এই ৪টি কারন নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই আর কারনের পেছনের কারনগুলো তুলে ধরতে চাই।

প্রথম পয়েন্টে আসি। একটা কথা আছে এক জায়গায় ৫ জন মানুষ বসে থাকলে অন্তত ৩ জনই সাংবাদিক। ক্রেডিট যাবে অনিবন্ধিত ও অযথা নিবন্ধিত পঙ্গপালের মতো এই পত্রিকা, সেই পোর্টাল, এই টিভি, সেই রেডিও তাদের কাছে। যারা কিনা পেশাদার সংবাদকর্মী নয় তারাও একটা পোর্টাল খুলে আজকাল সাংবাদিক হয়ে যাচ্ছে। একটা উপজেলাতেই ৫-৭টা লোকাল পোর্টাল/পত্রিকা পাওয়া যাচ্ছে। সময় থাকতে এদের বেড়ে ওঠা থামানো হয় নি। এখনো কঠোর ভাবে এসব অনিবন্ধিত গণমাধ্যমগুলোর প্রচারনা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে অসাধু মোটিফের কিছু লোকজন সাংবাদিক নাম ভেঙ্গে যা খুশী তাই করছে আর সংবাদের বলাৎকার করে বেড়াচ্ছে।

এবার আসুন এর জন্য দায়ী কারা সেটা দেখা যাক। প্রথমত, তথ্য অধিদপ্তর কে দায়ভার নিতে হবে। তারপর আপনাকে আমাকে নিতে হবে। কারন এদের সংবাদ আপনি-আমিই পড়ছি আবার শেয়ার ও করছি (আপনি নিজের স্ট্যান্ডার্ড ধরলে হবে না, গণমানুষের স্ট্যান্ডার্ড ধরুন)। ট্র্যাশ কে যদি আপনি প্রোডাক্টের সাথে গুলিয়ে ফেলেন তাহলে দোষ আপনার। তাই ট্র্যাশের দায়ভার মেইন্সট্রীম কে দিবেন না। আপনি হয়তো খুব ভাল হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ফার্মে জব করেন, তাই বলে কি আপনি এটা অস্বীকার করবেন দেশে অনেক হাসপাতাল , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ফার্মের সেবার মান ট্র্যাশে পরিণত হয় নি?

দ্বিতীয় পয়েন্টে আসা যাক। মূলধারার সংবাদমাধ্যম গুলো কেন সংবাদের মান ও শিরোনাম নিয়ে আপোস করছে? এর কারন ১। নিম্ন-মানের সংবাদকর্মী নিয়োগ ২. প্রতিষ্ঠানের অতি-ব্যবসায়িক মনোভাব ৩. পাঠকের চাহিদা।

আপনি জেনে অবাক হবেন ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী অনেক বড় বড় মিডিয়া হাউস বেতন দেয় না। নামে মাত্র বেতনে নিয়োগ দিয়ে আপনি তাদের কাছে কেমন সেবা আশা করতে পারেন? বাইকে প্রেস লাগিয়ে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর লোভে এ পেশায় আশা ছেলেটার কাছে আপনি কি আশা করেন? সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করা ছেলেমেয়েরা এখন বিসিএস বা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে কারন এ পেশায় শ্রমের যোগান চাহিদার থেকে অনেক বেশি তাই দক্ষ শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার ভয়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছে।

তারপর আসুন প্রতিষ্ঠানের অতি-ব্যবসায়িক মনোভাব। মনে রাখবেন আর দশটা ইন্ডাস্ট্রির মতো মাস-মিডিয়াও একটি বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি যেখানে দিনশেষে প্রফিট এট এনি কস্টের মতো আন-ইথিক্যাল ব্যাপারটাও ইথিক্স। তাদের ভিউ দরকার আর সেটার জন্য তারা মানে/শিরোনামে আপোস করতে দ্বিধা করে না।

আচ্ছা তাহলে নিম্ন মানের সংবাদ বা চটকদার শিরোনাম কীভাবে এত ভিউ পায়? আবারো আপনি আর আমি দায়ী। পাবলিক ডিমান্ড যেমন, মিডিয়া সাপ্লাই ও তেমন দেয়। আপনি কোনো সেলিব্রেটিকে নিয়ে চটকদার শিরোনাম করলে বা আজগুবি কোনো টপিকে লেখা পেলে ক্লিক করার লোভ সামলাতে পারেন না। অথচ অনেক গবেষণামূলক লেখা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। নিজের রুচিবোধকেও উন্নত করুন। চাহিদা কমান, যোগান ও কমবে এসবের।

৩য় পয়েন্ট আসলেই স্পর্শকাতর। আমাদের সবারই একটা নিজ নিজ বায়াস আছে। যে সংবাদ আমাদের বায়াসকে কনফার্ম করে আমরা সেটা শেয়ার করতে পছন্দ করি আর যেটা তার পরিপন্থী হয় তাকে খিস্তি করি। ধরুন হেফাজত ইস্যুতে জাতি দুইভাগে বিভক্ত ছিল। এখন কোনো ফ্যাক্ট যদি প্রচার করা হয়, অর্থাৎ যা ঘটতে দেখা যাচ্ছে তা যদি প্রচার করা হয় তাহলে একপক্ষ সাংবাদিকদের গালমন্দ করবে। আবার ইহকাল ও পরকালের ফয়সালাও করে ফেলবে। আবার অনেক সময় কিছু সাহসী গণমাধ্যম সরকারের নানা অসঙ্গগতি তুলে ধরলে তখন আরেকপক্ষ সে সাংবাদিকদের দেশ ও জাতির বিরোধী বলে আখ্যা দেয়। প্রায় সব সংবাদই কাউকে না কাউকে অখুশী করে আর এখন তো নিউজের নীচে কমেন্ট সেকশন আছেই, আপনি আমি গিয়ে সেখানে খিস্তি করে আসছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে মেইন্সট্রীম মিডিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারলে এক মহলের বিরাট উপকার হয়। এতে করে তাদের কুকীর্তী সামনে এলেই গুজব বলে চালিয়ে দিতে পারবে।

৪ নম্বর পয়েন্টটাই হাল আমলের হট টপিক। ইচ্ছে করেই এটা সবার নীচে রেখেছি যাতে দুই লাইন পরে মন্তব্য করা লোকেদের যন্ত্রনা থেকে বাঁচতে পারি। কেন ক্ষেত্র বিশেষে মিডিয়া নীরব অথবা বিক্রিত? তাহলে শুনুন, এতদিন আপনি একটা ইউটোপিয়ায় বসবাস করছিলেন। বিশ্বের সব দেশের সব গণমাধ্যমকর্মীই কোথাও না কোথাও নিজের অটোনমি হারিয়েছেন। যে সংবাদ্গুলো আমরা দেশীয় বা বিদেশী মিডিয়ায় দেখি সেগুলো ৫টা ফিল্টার হয়ে তারপর আমাদের কাছে আসে। ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড মিডিয়া পড়াতে গিয়ে এ নিয়ে লেকচার দিয়ে থাকি আমি। আগ্রহী হলে একদিন একটা ওপেন টকের আয়োজন করুন। স্ট্যাটাসে সেই দীর্ঘ থিওরি বুঝানো কষ্টসাধ্য।

তবে কিছু কথা সোজা করে বলি। আপনার ধারনা সংবাদ মাধ্যমের মালিক নিজে সাংবাদিক? না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মালিক একজন ব্যবসায়ী যিনি কিনা আবার রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে থাকতে পারেন। তাহলে সাংবাদিক এখানে প্রলেতারিয়েত, তাহলে বুর্জোয়া কে? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনিও তো একজন প্রলেতারিয়েত বলে আপনার প্রতিষ্ঠানের অনেক অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে যান, অনেক জায়গায় সেবার সাথে আপোস করেন কারন আপনি না করলে কাজটা আরেকজন কে দিয়ে করানো হবে তাই না? বলতে পারেন যে সাংবাদিকতা তো খুব সেন্সিটিভ জায়গা। আচ্ছা কোনটা সেন্সিটিভ না? একটা রেস্তোরাঁ যদি মানে আপোস করে সেটা সাধারণ ব্যাপার? আপনি যে হাসপাতালে কাজ করেন সেখানে অহেতুক ল্যাব পরীক্ষায় প্রচুর টাকা নিচ্ছে সেটা নিয়ে কি করবেন? সেই সিস্টেমের বিপক্ষে কিছু বলবেন? শিক্ষক ক্লাসে না পড়িয়ে ব্যাচে যেতে চাপ দিচ্ছেন সেটা নিয়ে কি বলবেন? আসলে আপনি বলবেন, শুধু যে সিস্টেমে আপনি কাজ করেন সেটাকে বাদ রেখে বাকি সব সিস্টেম নিয়ে বলবেন। আপনি শিক্ষক? লেকচারে ইতিহাস নিয়ে সত্য অথচ সংবেদনশীল কিছু বলে ফেলেছেন, রিপোর্ট চলে গেলে, ব্যস আপনার সুর পরদিন বদলে যাবে। এদেশে আইনজীবী, পুলিশ, সাংবাদিক সবাই টাকা আর ক্ষমতার কাছে বিক্রি যায়, বশ্যতা স্বীকার করে। শিল্পপতি আর রাজনীতিবিদদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আপনি চাইলেই যা খুশী লিখতে পারেন কিন্তু ছাপতে পারেন না। প্রথমত ছাপবে না আর ছাপলেও আপনাকে অনেক কন্সিকোয়েন্স ফেইস করতে হবে। একজন সাংবাদিক বা তার হাউজ কত বড় বড় মামলা খায় সত্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে সেটা এ পেশায় না থেকে বুঝবেন না।

দিনশেষে একজন সাংবাদিক শুধুই শ্রমিক যার উৎপাদনের বাকী ৩ টি উপাদান ভূমি, মূলধন ও সংগঠন নেই। (সাংবাদিক সংগঠনকে যেমন প্রেসক্লাব আবার উৎপাদনের সংগঠনের সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না) সংবাদমাধ্যম কে যতদিন পর্যন্ত বিগ পাওয়ার এন্ড বিগ মানির প্রভাবমুক্ত করতে না পারবেন, দেশে কেন বিদেশেও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা আশা করতে পারবেন না। নাহলে বিবিসি/সিএনএন এর মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো এভাবে ইসলামোফোবিয়ে ক্রিয়েট করতো না।

তাহলে কি আমি সাংবাদিকদের পক্ষ নিচ্ছি? না, আমি শুধু বলতে চাচ্ছি পেছনের বাস্তবতা না জেনে সংবাদ জগত থেকে এত বেশি প্রত্যাশা করা উচিৎ নয়। সংবাদ মাধ্যমকে যুগে যুগে “কন্সেন্ট ম্যানুফেকচার” করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। হিটলারের গ্যাস চেম্বার ও বিজ্ঞানী/ইঞ্জিনিয়াররাই ডিজাইন করেছিল। এসবের মাঝেও কিছু সাংবাদিক স্বপ্ন দেখে সত্যকে তুলে ধরার। জীবন বাজি নিয়ে সংবাদের খোঁজে ছুটে চলে তারা। তারা হয়তো তাদের স্বপ্নের শতভাগ দিতে পারে না, আপনি বা আমিও কি নিজ নিজ পেশায় শতভাগ দিতে পারছি?

তাই ঢালাওভাবে গালি দেয়ার আগে ভাবুন। আমরা বুর্জোয়াদের দায়ী না করে প্রলেতারিয়েত কে গালি দিয়ে নিজেকে সাধু প্রমাণ করার চেষ্টা করছি না তো? আর থুতু ছেটালে নিজের গায়েও পড়বে কারন দিনশেষে আপনিও ফেইসবুক সাংবাদিক, অসংখ্যবার প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতে আপনিও সাহায্য করেছেন এবং তার জন্য বেতনও পান নি।
শান্তি।

শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিক

(Visited 1 times, 1 visits today)

আরও পড়ুন

সংসদ সদস্য নায়ক ফারুক আইসিইউতে
শস্য চিত্রে বঙ্গবন্ধু: গিনেসের শর্তগুলো মানা হয়েছে শতভাগ
মৈত্রী সেতু বাংলাদেশের সঙ্গে তিন দেশের বাণিজ্য সহজ করবে: প্রধানমন্ত্রী
জামাল খাশোগি হত্যায় ৭৬ সৌদি নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন পিলখানায় নিহত সেনাদের সমাধিতে
টিকা নিলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতি মেনে চলুন: প্রধানমন্ত্রী
আত্মহত্যা ঠেকাতে মন্ত্রী নিয়োগ
র‌্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ঔষধসহ গ্রেফতার ১